অনলাইন নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

সুশাসনে দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক আমলাতন্ত্র অপরিহার্য

বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে দক্ষ, সৎ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক আমলাতন্ত্র অপরিহার্য। রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাষ্ট্রের নীতি ও উন্নয়নের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। অন্যদিকে, সেই নীতি বাস্তবায়ন, সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রধান দায়িত্ব পালন করে প্রশাসন।

তাই আমলাতন্ত্রকে কেবল একটি সরকারি কাঠামো হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং জনগণের সেবায় নিবেদিত, পেশাদার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, অঞ্চল, আর্থসামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের ভিত্তিতে নয়, যোগ্যতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রত্যেক নাগরিক যেন সমান সুযোগ পান।

রাষ্ট্র পরিচালনায় আমলাতন্ত্রের গুরুত্ব

মন্ত্রীদের রাজনৈতিক দায়িত্ব ও কার্যকাল পরিবর্তনশীল। কিন্তু অভিজ্ঞ আমলারা দীর্ঘ কর্মজীবনে রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে মূল্যবান জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

এই সম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হলে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও কর্মমূল্যায়নে মেধা, সততা, অভিজ্ঞতা এবং কর্মদক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দ্রুত ও জনবান্ধব করা প্রয়োজন।

সরকারি প্রকল্পের ব্যয়, সময়সীমা, গুণগত মান এবং বাস্তব সুফল নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জনগণের অর্থ জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হয়।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় জরুরি

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত সরকার তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন করবে। অন্যদিকে, প্রশাসন আইন, বিধিবিধান ও সংবিধানের আলোকে পেশাদারভাবে সেই নীতি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে। এ দুইয়ের মধ্যে সুস্থ সমন্বয় রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য শর্ত।

কোনো কর্মকর্তা পেশাগত নিরপেক্ষতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্য বা ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে সরকারি সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে প্রশাসনের সব কর্মকর্তাকে একই দৃষ্টিতে বিচার করাও যুক্তিসংগত নয়। অনেক কর্মকর্তা নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে।

পাশাপাশি অনিয়ম বা দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। জবাবদিহি যেমন অপরিহার্য, তেমনি সৎ কর্মকর্তাদের অযৌক্তিক চাপ ও প্রতিহিংসামূলক আচরণ থেকে সুরক্ষাও প্রয়োজন।

সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে

রাষ্ট্রের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন এর সুফল সমাজের সব শ্রেণি ও জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়। সরকারি চাকরি, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি এবং নেতৃত্বের সুযোগে বৈষম্যহীন ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগ্য নাগরিকদের অংশগ্রহণের বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি।

সমান সুযোগের অর্থ শুধু একই নিয়ম ঘোষণা করা নয়; বরং নিয়োগ ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ মানদণ্ড, বৈষম্য প্রতিরোধ, ন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। পরিচয় বা সুপারিশের পরিবর্তে যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও কাজের ফলাফল যেন মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি হয়। এর ফলে প্রশাসনে বৈচিত্র্য, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং জনসেবার মান বাড়বে।

রাষ্ট্রের উন্নয়নে ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা

রাষ্ট্রের উন্নয়নে শ্রমিক, কর্মচারী এবং তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রেড ইউনিয়ন শুধু দাবি আদায়ের সংগঠন নয়; এটি শ্রমিকের অধিকার রক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দক্ষতা বৃদ্ধি, ন্যায্য মজুরি প্রতিষ্ঠা এবং উৎপাদনশীলতা উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে।

এ জন্য ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বকে জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত নৈতিকতায় সমৃদ্ধ হতে হবে। যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কার্যকর শ্রমসম্পর্ক ব্যবস্থার ইতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে প্রশিক্ষণভিত্তিক নেতৃত্ব, প্রমাণনির্ভর আলোচনা, সমঝোতা, মধ্যস্থতা এবং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি শক্তিশালী করা যেতে পারে।

তবে কোনো দেশের মডেল সরাসরি অনুকরণ না করে বাংলাদেশের আইন, শ্রমবাজার ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা প্রয়োগ করতে হবে।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও দায়িত্বশীল শ্রমিক সংগঠন প্রয়োজন

ট্রেড ইউনিয়নকে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব কিংবা সংকীর্ণ স্বার্থের বাইরে রেখে সদস্যদের প্রকৃত কল্যাণে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগকর্তা ও সরকারের উচিত শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।

ধর্মঘট বা বিরোধের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা, শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আরও টেকসই করতে পারে।

প্রশাসনিক সংস্কার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে

বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে প্রশাসনিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ডিজিটাল সেবা, সময়সীমাবদ্ধ সিদ্ধান্ত, উন্মুক্ত তথ্যপ্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা, কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়নকে প্রশাসনের নিয়মিত চর্চায় পরিণত করা প্রয়োজন।

সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের মধ্যে গঠনমূলক সহযোগিতাও বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে সরকারি সেবার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা শক্তিশালী হতে পারে।

সমন্বিত উদ্যোগেই সম্ভব টেকসই উন্নয়ন

রাষ্ট্রের শক্তি কেবল ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান কিংবা উন্নয়ন বাজেটের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং সেই ক্ষমতা ও সম্পদ কতটা সততা, দক্ষতা, ন্যায্যতা এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার ওপরই প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, পেশাদার আমলাতন্ত্রের দক্ষতা, ট্রেড ইউনিয়নের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ—এই চারটি ভিত্তিকে সুদৃঢ় করতে পারলে বাংলাদেশে সুশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও টেকসই উন্নয়নের পথ আরও সুগম হবে।

লেখক:
ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন, এমবিই
মানবাধিকার সংগঠক, পরিবেশ, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
চেয়ারম্যান, New Hope Global, Birmingham, UK

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

এক দিনেই শেষ জিদানের প্রথম ম্যাচের সব টিকিট

1

উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে রাজপথে বিশৃঙ্খলা: প্রধানমন্ত্রী

2

ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে জানলেন তিনি ‘মৃত’

3

মুখে নয়, মাঠেই হবে লড়াই

4

আইভরি কোস্টকে হারিয়ে নকআউটে জার্মানি

5

ইতিহাসের রাজকীয় পাত থেকে মতিঝিলের খাবার দোকান

6

শততম ম্যাচে রেকর্ডের ঝড় তুললেন এমবাপ্পে

7

ইরান প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, নয়তো ট্রাম্পের হাতে বিকল্প রয়

8

সোনার দাম কমল ভরিতে ২১৫৮ টাকা

9

এইচএসসিতে নকল পেলে প্রতিষ্ঠানপ্রধানও শাস্তির মুখে

10

খুলনা শিপইয়ার্ডে নির্মাণ হচ্ছে আধুনিক সামুদ্রিক গবেষণা জাহাজ

11

সংরক্ষিত নারী প্রার্থীদের যত সম্পদ

12

মেয়র নির্বাচনে প্রস্তুত ইশরাক হোসেন

13

চুক্তি না হলে ধ্বংসের হুঁশিয়ারি: ইরানকে কঠোর বার্তা ট্রাম্পে

14

তৃণমূল থেকে অপসারিত মমতা, এরপরে কী

15

গোলদাতার গণ্ডি পেরিয়ে বেলজিয়ামের পথপ্রদর্শক লুকাকু

16

তরুণদের মধ্যে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি

17

ঘোড়াশালে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে ডাকাতি

18

আইনজীবী পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন, ট্রাম্পের নতুন প্রেস সেক্রেটারিকে

19

জাতীয় কনভেনশন সামনে রেখে আজ জরুরি সংবাদ সম্মেলন করবে এনসিপি

20