চোখ মহান আল্লাহর অন্যতম নিয়ামত। এই চোখ দিয়েই মানুষ পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করে, জ্ঞান অর্জন করে এবং চারপাশের নানা বিষয় সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। তবে দৃষ্টির যথাযথ হেফাজত না করলে তা মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এ কারণে ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটে নানা ধরনের কনটেন্টের সহজলভ্যতার কারণে দৃষ্টি সংযত রাখা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। তবে সচেতনতা, আত্মসংযম ও আল্লাহর প্রতি ভয় থাকলে এ বিষয়ে সতর্ক থাকা সম্ভব। চোখের গুনাহ থেকে বাঁচতে পাঁচটি আমল তুলে ধরা হলো।
চোখের গুনাহ থেকে বাঁচার প্রথম উপায় হলো দৃষ্টি সংযত রাখা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিন পুরুষ ও নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং পবিত্রতা রক্ষা করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। ... আর মুমিন নারীদেরও বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা আন-নুর, আয়াত: ৩০–৩১)
অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো অনুচিত দৃশ্য চোখে পড়ে গেলে তা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার তাকানো বা দৃষ্টিকে দীর্ঘায়িত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
হজরত জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আকস্মিক দৃষ্টি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাঁকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে নির্দেশ দেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৫৯)
মানুষ একা থাকলে অনেক সময় এমন কাজের সুযোগ পায়, যা অন্যের সামনে করতে সংকোচ বোধ করে। বিশেষ করে মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় নিজের দৃষ্টির হেফাজত করা ঈমান ও আত্মসংযমের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
একজন মুমিনের মনে রাখা উচিত, মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও আল্লাহর কাছে কিছুই গোপন নয়। তাই নির্জনে অশালীন কনটেন্ট দেখা থেকে বিরত থাকা এবং নিজের কাজের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কথা স্মরণ করা প্রয়োজন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সে, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।’ (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
যে পরিবেশ বা অভ্যাস মানুষকে পাপের দিকে আকৃষ্ট করে, তা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা উচিত। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন ছবি, ভিডিও ও নানা ধরনের অনুচিত কনটেন্ট সহজেই সামনে চলে আসে।
এ ক্ষেত্রে কিছু অভ্যাস কাজে আসতে পারে:
অশালীন কনটেন্ট প্রকাশ করে এমন পেজ ও অ্যাকাউন্ট আনফলো বা ব্লক করা।
অনুচিত ভিডিও সামনে এলে তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে দেওয়া।
অপ্রয়োজনীয়ভাবে স্ক্রল করার সময় কমানো।
একাকী মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিজের জন্য সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩২)
কোরআন মানুষের জন্য হেদায়াত ও জীবন পরিচালনার দিকনির্দেশনা। নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি এর অর্থ বোঝা এবং শিক্ষাগুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করা উচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথ দেখায়, যা সবচেয়ে সরল।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৯)
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় কোরআন তিলাওয়াত, অর্থ পাঠ, জিকির ও দোয়ার জন্য রাখা যেতে পারে। এসব আমল আল্লাহর স্মরণ বাড়াতে এবং নিজের আচরণ নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে সহায়তা করে।
প্রবৃত্তির তাড়না নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে দৃষ্টি সংযত রাখাও সহজ হতে পারে। এ কারণে সামর্থ্য অনুযায়ী নফল রোজা রাখা এবং নিয়মিত ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কারণ, তা দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে। আর যে সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কারণ, রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪০০)
রোজার পাশাপাশি তাহাজ্জুদ, নফল নামাজ, জিকির ও দোয়ার অভ্যাস আত্মসংযম বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে এসব ইবাদতের উদ্দেশ্য শুধু চোখের গুনাহ থেকে বাঁচা নয়; বরং সামগ্রিকভাবে আল্লাহর আনুগত্য ও আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া।
চোখের হেফাজত শুধু একটি মুহূর্তের সিদ্ধান্ত নয়; এটি নিয়মিত চর্চার বিষয়। অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো অনুচিত দৃশ্য চোখে পড়লে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া, পাপের সুযোগ তৈরি করে এমন অভ্যাস এড়িয়ে চলা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া—এসবের মাধ্যমে আত্মসংযমের চর্চা করা যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের দৃষ্টি, অন্তর ও চরিত্রের হেফাজত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মন্তব্য করুন