স্ত্রী পর্দা পালন করতে চান, কিন্তু পরিবারের বাধা, গ্রামীণ পরিবেশ ও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তা যথাযথভাবে সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে স্বামীর করণীয় কী? বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে স্ত্রীর পর্দা পালনের ব্যবস্থা করা যায়, সে বিষয়ে ধর্মীয় পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকার জামিয়া বাবুস সালামের মুফতি ও মুহাদ্দিস জাওয়াদ তাহের।
তিনি বলেন, স্ত্রীর পর্দা পালনে সহযোগিতা করা স্বামীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান, সদ্ব্যবহার ও তাঁদের অধিকার রক্ষা করাও জরুরি। তাই এ ধরনের পারিবারিক সমস্যার সমাধানে সংঘাতের পথে না গিয়ে ধৈর্য, বিনয় ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্দা পালনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করতে হবে।
সম্প্রতি এক ব্যক্তি এ বিষয়ে ধর্মীয় পরামর্শ চেয়ে জানান, তিনি ঢাকায় চাকরি করেন এবং তাঁর স্ত্রী গ্রামে থাকেন। সেখানে স্ত্রীকে ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করতে হয়। তিনি পরিপূর্ণ পর্দা পালন করতে চাইলেও শ্বশুর-শাশুড়ির কারণে তা যথাযথভাবে সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় স্ত্রীকে ঢাকায় এনে নিজের কাছে রাখার ব্যবস্থাও করতে পারছেন না।
জবাবে মুফতি জাওয়াদ তাহের ধর্মীয় বিধান মেনে চলার পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেন।
মুফতি জাওয়াদ তাহের বলেন, ইসলামে যেসব পুরুষের সামনে নারীর পর্দা করা আবশ্যক, তাঁদের সামনে যথাযথ পর্দা বজায় রাখতে হবে। স্বামীর ভাই—অর্থাৎ দেবর ও ভাসুর—সহ অন্যান্য গায়রে মাহরাম পুরুষের ক্ষেত্রেও এ বিধান প্রযোজ্য।
এ প্রসঙ্গে তিনি সহিহ বুখারির একটি হাদিস উল্লেখ করেন। হাদিসটিতে স্বামীর নিকটাত্মীয় পুরুষদের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পারিবারিক সম্পর্কের কারণে গায়রে মাহরাম পুরুষের সঙ্গে অবাধ মেলামেশাকে স্বাভাবিক হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। বরং শরিয়তের বিধান অনুযায়ী শালীনতা ও পর্দা বজায় রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
পাশাপাশি পারিবারিক বাস্তবতা ও কর্মপরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে পর্দা পালনের উপযুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে।
স্ত্রীর পর্দার বিষয়টি নিয়ে প্রথমেই বাবা-মায়ের সঙ্গে বিরোধে না জড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন এই আলেম। তাঁর মতে, স্বামীর উচিত বাবা-মায়ের সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে কথা বলা এবং পর্দার ধর্মীয় গুরুত্ব বোঝানো।
বাবা-মাকে বোঝানো যেতে পারে, স্ত্রী তাঁদের সেবা-যত্ন করতে এবং সংসারের কাজে সহযোগিতা করতে আগ্রহী। তবে এসব কাজ করার সময় যেন তিনি শরিয়তসম্মত পোশাকে পর্দা বজায় রাখতে পারেন, সে সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
এ জন্য ঘরের কাজের ধরন ও সময়সূচিতে কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে। কাজ এমনভাবে ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে, যাতে গায়রে মাহরাম পুরুষদের সামনে আসার প্রয়োজন কমে যায়। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় পর্দা পালনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হলে স্ত্রীর জন্য ধর্মীয় অনুশীলন বজায় রাখা সহজ হবে।
স্বামীর দায়িত্ব শুধু স্ত্রীকে পর্দা পালনের কথা বলা নয়; বরং বাস্তবে তিনি কীভাবে তা পালন করতে পারবেন, সে বিষয়ে পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে সমাধান খোঁজাও গুরুত্বপূর্ণ।
মুফতি জাওয়াদ তাহেরের বক্তব্য অনুযায়ী, বাবা-মা যদি এমন কোনো কাজে বাধ্য করেন, যা শরিয়তবিরোধী, তাহলে সে কাজে তাঁদের আনুগত্য করা যাবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা যাবে কিংবা তাঁদের অধিকার উপেক্ষা করা যাবে।
ইসলামের একটি মৌলিক নীতি তুলে ধরে তিনি বলেন, আল্লাহর অবাধ্যতা হয়—এমন কাজে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যায় না। অর্থাৎ ধর্মীয় বিধান পালনের ক্ষেত্রে সচেতন থাকার পাশাপাশি বাবা-মায়ের সঙ্গে আচরণেও শালীনতা ও সদ্ব্যবহার বজায় রাখতে হবে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে উত্তেজিত হয়ে সম্পর্ক নষ্ট করার পরিবর্তে ধৈর্য ধরে কথা বলা, পরিবারের অন্য সদস্যদের সহযোগিতা নেওয়া এবং পর্দা পালনের বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা খুঁজে বের করা জরুরি।
প্রশ্নকারী জানিয়েছেন, তিনি ঢাকায় চাকরি করলেও স্ত্রীকে নিজের কাছে এনে রাখার মতো আর্থিক সামর্থ্য এখনো তাঁর নেই। এ অবস্থায় স্ত্রীকে গ্রামে রেখে কীভাবে পর্দার ব্যবস্থা করা যায়, সে বিষয়েও পরামর্শ দিয়েছেন মুফতি জাওয়াদ তাহের।
তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী, স্ত্রীর পর্দা ও দ্বীনদারি রক্ষার জন্য গ্রামে চাকরি বা ব্যবসার ব্যবস্থা করা কিংবা স্ত্রীকে নিজের কাছে নিয়ে আসার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও সামর্থ্য অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আপাতত স্ত্রীকে কাজের জন্য ঘরের বাইরে যেতে হলে ঢিলেঢালা বোরকা বা সাধারণ পোশাক পরার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বড় ওড়না দিয়ে মাথা, বুক ও পিঠ ঢেকে রাখা এবং মুখ ঢাকার জন্য নিকাব বা বড় মাস্ক ব্যবহারের কথাও বলেছেন।
এসব তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে স্ত্রীর জন্য আরও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আর্থিক সামর্থ্য বাড়লে স্ত্রীকে নিজের কাছে নিয়ে আসা, কাজের বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজা কিংবা পরিবারের সহযোগিতায় পর্দাবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।
নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের বিষয়ে পবিত্র কোরআনের সূরা আত-তালাকের সপ্তম আয়াতের উদ্ধৃতি দেন মুফতি জাওয়াদ তাহের। আয়াতটির অর্থ হলো, আল্লাহ কাউকে তাঁর দেওয়া সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।
এ আয়াতের আলোকে তিনি প্রশ্নকারীকে সামর্থ্য অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে স্ত্রীকে ঢাকায় এনে রাখার ব্যবস্থা করতে না পারলেও সমস্যাটিকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে কীভাবে পর্দা পালন সহজ করা যায়, তা নিয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।
একই সঙ্গে বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে পারিবারিক দায়িত্ব ও ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্যে ভারসাম্য রাখা যায়।
মন্তব্য করুন