যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ককে ‘সত্যিকারের প্রতিভাবান’ বলে প্রশংসা করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। স্যাটেলাইট প্রযুক্তি নিয়ে মাস্কসহ মার্কিন অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার মস্কোয় রাশিয়া-আফ্রিকা সম্মেলনের সময় পুতিন রাশিয়ার নিজস্ব স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রকল্প ‘রাসভেত’ নিয়ে কথা বলেন। এ সময় তিনি রাসভেত ও মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সম্মেলনে ইলন মাস্ক সম্পর্কে পুতিন বলেন, ‘তিনি একজন প্রতিভাবান, সত্যিকারের প্রতিভাবান। মাস্কসহ আমাদের মার্কিন অংশীদারদের সঙ্গে আমরা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছি।’
রুশ প্রেসিডেন্টের ভাষ্য, রাসভেত ও স্টারলিংকের স্যাটেলাইটগুলো যাতে কক্ষপথে একে অপরের কার্যক্রমে বিঘ্ন না ঘটায়, সে জন্য যোগাযোগ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
পুতিন বলেন, রাজনৈতিক নানা মতপার্থক্য থাকলেও মহাকাশ প্রযুক্তির মতো বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
তবে পুতিনের বক্তব্য থেকে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
রাসভেত রাশিয়ার পরিকল্পিত স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রকল্প। এর লক্ষ্য স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়া। অন্যদিকে, স্টারলিংক হলো স্পেসএক্সের পরিচালিত স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক, যা বিশ্বের বহু দেশে সেবা দিচ্ছে।
স্টারলিংকের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের আকার রাসভেতের তুলনায় অনেক বড় বলে বিভিন্ন উন্মুক্ত সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মোট সংখ্যা এবং বর্তমানে কক্ষপথে সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা এক নয়। তাই দুই প্রকল্পের তুলনা করতে হালনাগাদ ও যাচাইকৃত পরিসংখ্যান প্রয়োজন।
রাশিয়ার দূতাবাস রাসভেতকে ‘স্টারলিংকের রুশ বিকল্প’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের বক্তব্য, এ খাতে রাশিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর দেশটির সামরিক ও যোগাযোগব্যবস্থায় স্টারলিংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত বা ব্যাহত হলে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
তবে স্টারলিংকের সংযোগ ও ব্যবহারের ওপর নির্ভরতা ইউক্রেনের জন্য ঝুঁকিও তৈরি করেছে। সংযোগে বিঘ্ন ঘটলে সামরিক যোগাযোগ ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম প্রভাবিত হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী স্টারলিংক সংযোগে সমস্যার কথা জানিয়েছিল। ইলন মাস্কও স্বীকার করেছেন, স্পেসএক্স ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু ক্ষেত্রে সংযোগ সীমিত করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ চলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি বাণিজ্য এবং বন্দিবিনিময়ের মতো বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানি নিয়ে একটি চুক্তির কথা জানিয়েছিলেন এবং পরে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেন। এ ছাড়া রুশ হেফাজতে থাকা এক মার্কিন নাগরিককে মুক্তি দেওয়ার ঘটনাও দুই দেশের যোগাযোগের আলোচনায় এসেছে।
তবে এসব ঘটনাকে সরাসরি মাস্ক ও পুতিনের স্যাটেলাইটবিষয়ক যোগাযোগের ফল হিসেবে দেখার মতো প্রমাণ প্রতিবেদনে নেই। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ইলন মাস্কের জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকায়। শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় সময় সেখানে কাটানোর পর তিনি কানাডায় যান এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হন।
টেসলা ও স্পেসএক্সসহ তাঁর একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত হয়। স্পেসএক্সের অংশ স্টারলিংক বর্তমানে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট খাতের অন্যতম আলোচিত সেবা।
মাস্ক যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান রাজনীতিকদের সমর্থন করেছেন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করেছেন।
মহাকাশ প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বিস্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাস্কের মতো বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ভূমিকা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তার আলোচনাতেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
মন্তব্য করুন