ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশটির জাতীয় নির্বাচন। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনে ভোট দিচ্ছেন দেশটির ভোটাররা। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোটের মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক সামরিক প্রধান ও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন শিবির।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং পরবর্তী সময়ে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ নেতানিয়াহুর নেতৃত্বকে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, যুদ্ধের পরিণতি এবং সরকারের নীতিমালা নিয়ে দেশটির জনগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের দাবি, নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে বর্তমান সরকারের জবাবদিহি প্রয়োজন। খবর রয়টার্স ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য সাধারণত অন্তত ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে নির্বাচনে কোনো দল বা জোট এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের জন্য ছোট দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের প্রসঙ্গ তুলে নেতানিয়াহুর পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
নেতানিয়াহুও দাবি করেছেন, ইরানের হুমকি মোকাবিলায় তাঁর নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতায় ফিরতে পারলে ইরানকে ঘিরে সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার সম্ভাবনার কথাও তিনি ইঙ্গিত করেছেন।
তবে ট্রাম্পের সমর্থন নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা ভোটের ফল প্রকাশের আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট ইসরায়েলের সাবেক সামরিক বাহিনীর প্রধান। তাঁর নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টি বিরোধী শিবিরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
আইজেনকটের প্রচারে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার জবাবদিহি, যুদ্ধ পরিচালনা এবং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি নেতানিয়াহুর প্রচারকৌশলের সমালোচনা করে বলেছেন, ইসরায়েলের পরবর্তী নেতৃত্ব নির্ধারণের অধিকার দেশটির ভোটারদেরই।
তবে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আইজেনকটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিভিন্ন মতাদর্শের বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরি করা।
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির পাশাপাশি তাঁর জোটে কট্টর ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে ইতামার বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার পার্টি এবং বেজালেল স্মোত্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম উল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে বিরোধী শিবিরে আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির পাশাপাশি নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন টুগেদার, আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু এবং ইয়ার গোলানের ডেমোক্র্যাটস রয়েছে।
এই দলগুলোর মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রশ্নে তাদের সহযোগিতা নির্বাচনের পর সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসরায়েলে ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না। তাঁরা রাজনৈতিক দল বা দলীয় তালিকাকে ভোট দেন। প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে নেসেটের আসন বণ্টন করা হয়।
কোনো দলকে সংসদে আসন পেতে মোট ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ অর্জন করতে হয়। নির্বাচনের পর বিভিন্ন দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলই যে নিশ্চিতভাবে সরকার গঠন করবে, এমন নয়।
ইসরায়েলের আরব বংশোদ্ভূত নাগরিকদের ভোট নির্বাচনের ফল ও পরবর্তী সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে বিরোধী শিবিরের মূল দলগুলোর সঙ্গে আরব দলগুলোর জোট বা সমর্থনের প্রশ্নে রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ছোট দলগুলোর অবস্থান এবং সম্ভাব্য জোটের সমীকরণই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে কে সরকার পরিচালনা করবেন।
নেতানিয়াহু ও আইজেনকট—দুজনের জন্যই সরকার গঠনের পথ সহজ নয়। নির্বাচনে কোনো শিবির ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের চেষ্টা করতে হবে।
ফলে ভোটের ফলই ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ধারণ করবে না; নির্বাচনের পর জোট গঠনের আলোচনা, দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতা এবং সংসদীয় সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মন্তব্য করুন