যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর ফল আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য নীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের—রাজনৈতিক অবস্থান তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথ সহজ বা কঠিন করে তুলতে পারে।
রিপাবলিকান পার্টি যদি প্রতিনিধি পরিষদ, সিনেট কিংবা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারায়, তাহলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে বৈদেশিক নীতিতে নতুন রাজনৈতিক বাধা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সামরিক পদক্ষেপ, ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ, সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কৌশল নিয়ে কংগ্রেসের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সম্ভাব্য এসব পরিবর্তনকে চারটি দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যায়।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক নীতিতে কংগ্রেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে সামরিক অভিযানের অর্থায়ন, নতুন প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
যুদ্ধের অর্থায়নে বাধা: মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, রাজস্বসংক্রান্ত বিল প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপিত হয়। ফলে সামরিক অভিযানের জন্য নতুন অর্থ বরাদ্দ বা অতিরিক্ত বাজেট অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রতিনিধি পরিষদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ডেমোক্র্যাটরা নিয়ন্ত্রণ পেলে ইরানকেন্দ্রিক সামরিক অভিযানের জন্য নতুন অর্থ বরাদ্দে শর্ত আরোপ বা বিল আটকে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
কংগ্রেশনাল তদন্ত ও তদারকি: প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক এবং সশস্ত্র বাহিনীবিষয়ক কমিটিগুলোর নেতৃত্ব বিরোধী দলের হাতে গেলে প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে তদন্ত ও শুনানি বাড়তে পারে। ইরান সংঘাত, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং পেন্টাগনের সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে হোয়াইট হাউস ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশনের প্রয়োগ: প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে পারে। এর মাধ্যমে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘ সময় সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা হতে পারে। তবে এ আইন প্রয়োগের সাংবিধানিক সীমা ও বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান দলের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে সমর্থন থাকলেও ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে এ নীতি নিয়ে মতপার্থক্য বেড়েছে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধ, বেসামরিক হতাহত এবং পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের বিষয়গুলো দলটির একাংশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অস্ত্র সরবরাহে শর্ত আরোপ: কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়লে ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইন মানার শর্ত যুক্ত করার উদ্যোগ জোরালো হতে পারে। কিছু অস্ত্র বিক্রি বা সামরিক সহায়তার বিষয়ে অতিরিক্ত পর্যালোচনা এবং আপত্তিও দেখা দিতে পারে।
গাজা ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে চাপ: গাজায় সামরিক অভিযান, মানবিক সহায়তা এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সমালোচনা বাড়তে পারে। কংগ্রেসের শুনানি, প্রস্তাব ও তদারকির মাধ্যমে ইসরায়েল সরকারের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা হতে পারে।
তবে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হলেই যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলনীতি সম্পূর্ণ বদলে যাবে, এমন নয়। দলটির ভেতরে ইসরায়েলকে সমর্থনের প্রশ্নে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। ফলে নীতিগত পরিবর্তনের মাত্রা নির্ভর করবে কংগ্রেসের সদস্যদের অবস্থান ও রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বড় অংশজুড়ে রয়েছে অস্ত্র বিক্রি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও পারমাণবিক প্রযুক্তি। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালে এসব বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে বাড়তি রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।
অস্ত্র বিক্রি ও পারমাণবিক চুক্তি পর্যালোচনা: সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বড় ধরনের অস্ত্র বিক্রি ও বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার চুক্তিতে কংগ্রেসের পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ। ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়লে এসব চুক্তির শর্ত, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বেশি প্রশ্ন উঠতে পারে।
মানবাধিকার ও আঞ্চলিক সংঘাত: উপসাগরীয় দেশগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি, ইয়েমেনসহ আঞ্চলিক সংঘাতে ভূমিকা এবং বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে কংগ্রেসের নজরদারি বাড়তে পারে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের সরাসরি কূটনৈতিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে কংগ্রেসের বিরোধিতা থাকলেই সব অস্ত্র চুক্তি বা পারমাণবিক সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নয়। চুক্তির ধরন, আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনের সঙ্গে আইনপ্রণেতাদের সমঝোতার ওপর এর পরিণতি নির্ভর করবে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিরোধী দল কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রেসিডেন্টের জন্য নতুন আইন পাস করানো এবং নিজস্ব নীতির অর্থায়ন নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এ পরিস্থিতিকে সাধারণত ‘ডিভাইডেড গভর্নমেন্ট’ বা বিভক্ত সরকার বলা হয়।
আইন প্রণয়নে বাধা: কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দলের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘরোয়া ও বৈদেশিক নীতিসংশ্লিষ্ট নতুন আইন পাসে বাধা তৈরি হতে পারে। বাজেট, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে সমঝোতা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাহী আদেশের ওপর নির্ভরতা: আইন প্রণয়নে বাধা তৈরি হলে ট্রাম্প প্রশাসন বিদ্যমান আইনের আওতায় নির্বাহী আদেশ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কিছু নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পারে। তবে নির্বাহী আদেশেরও আইনি সীমা রয়েছে; কংগ্রেসের আইন, আদালতের রায় কিংবা বরাদ্দ করা অর্থের বিকল্প হিসেবে এগুলো ব্যবহার করা যায় না।
বিদেশি নীতিতে অনিশ্চয়তা: কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে মতবিরোধ বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ধারাবাহিকতা নিয়ে মিত্র ও প্রতিপক্ষ—উভয় পক্ষের মধ্যেই প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো দেশগুলোও ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেই প্রেসিডেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘লেম ডাক’ হয়ে যান না। তাঁর সাংবিধানিক মেয়াদ ও নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকে। বরং কংগ্রেসে বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণ থাকলে আইন প্রণয়ন ও নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নের সক্ষমতা সীমিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিতে রাজনৈতিক চাপ ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা বাড়তে পারে। বিশেষ করে ইরান সংঘাত, ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক চুক্তির ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হতে পারে।
তবে পররাষ্ট্রনীতির সব সিদ্ধান্ত কংগ্রেসের হাতে নয়। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা, বিদ্যমান আইন, সামরিক কমান্ড কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে।
সুতরাং নির্বাচনের ফল আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এর প্রভাব নির্ভর করবে কংগ্রেসের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ, হোয়াইট হাউসের কৌশল এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর।
মন্তব্য করুন