ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দুই দশক ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়াকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেছেন আইন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী এবিন বাসিল। দীর্ঘদিন অনশনে থাকায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর ছাত্র সংসদ পুনর্বহালের দাবিতে অনশন শুরু করেন বাসিল। বৃহস্পতিবার তাঁর অনশনের ১৮তম দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ভবনে একটি মাদুরে শুয়ে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। পাশে রয়েছেন কয়েক ডজন সহপাঠী ও সমর্থক। বাসিল বলেছেন, “শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি লড়াই করে যাব।”
আন্দোলনের মূল অনশনকারীদের মধ্যে বাসিলসহ পাঁচজন রয়েছেন। শুরুতে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী অনশনে যোগ দিলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁদের কেউ কেউ সরে দাঁড়িয়েছেন। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে উর্দু-ফারসি কবি মির্জা গালিবের ভাস্কর্যসংলগ্ন এলাকায় শত শত শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করছেন।
গত ১৬ অক্টোবর বাসিলকে এক বছরের জন্য সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অনশনে অংশ নেওয়া আরও দুই শিক্ষার্থীর ক্যাম্পাসে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
গত ২৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরাসরি ক্লাসের পরিবর্তে অনলাইনে পাঠদান শুরু হয়। একই সঙ্গে আবাসিক শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে চাপ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ক্যাম্পাসের বাইরে সশস্ত্র পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া চারজনের বেশি মানুষের জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশনা অনুসারে ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্রের খসড়া তৈরি ও অনুমোদনের পর ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
গঠনতন্ত্রের খসড়া তৈরির জন্য আগামী ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে খসড়াটি অনুমোদনের নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাঁদের মতে, এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র সাইমা সাঈদ বলেছেন, গত ২০ বছরের মধ্যে তাঁরাই প্রথম শিক্ষার্থীদের ছাত্র সংসদের দাবি মেনে নিয়েছেন। তবে গঠনতন্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা, সরকারি সুপারিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হচ্ছে।
১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮১ সালে। ক্যাম্পাসে অস্থিরতার কারণে ১৯৯৭ সালে নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০০৫ সালে আবার নির্বাচন শুরু হলেও পরের বছর উপাচার্যের ওপর কথিত হামলার ঘটনার পর ছাত্র সংসদ বিলুপ্ত করা হয়।
এরপর ২০১১ সালে উচ্চ আদালতে আবেদন এবং ২০১৭ সালে অনশনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
দীর্ঘ অনশনের কারণে বাসিলের ওজন সাত কেজি কমেছে। তিনি জানিয়েছেন, এখন অন্যের সাহায্য ছাড়া হাঁটতেও পারছেন না। রক্ত পরীক্ষায় তাঁর শরীরে সোডিয়াম ও গ্লুকোজের মাত্রা কম পাওয়া গেছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নির্বাচিত ছাত্র সংসদ না থাকায় আবাসিক হল, ক্যানটিন, ফি বৃদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন বিধিনিষেধ নিয়ে সম্মিলিতভাবে কথা বলার সুযোগ সীমিত। তাঁদের দাবি, ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠিত হলে প্রশাসনের একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।
ভারতের আরেক সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভ ও ১৯ দিনের অনশনের পর কর্তৃপক্ষ আগামী ৫ নভেম্বর নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে।
জামিয়া ও আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ভারতের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
মন্তব্য করুন