ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার সম্ভাবনা যাচাই করতে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজাইকে চিঠি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তবে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে। এতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আবারও সংঘাত শুরুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে ভ্যান্সের চিঠি এবং সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মতপার্থক্য কমিয়ে নতুন করে সামরিক সংঘাত এড়ানোর মতো সমঝোতার সুযোগ রয়েছে কি না, তা যাচাই করাই চিঠিটির অন্যতম উদ্দেশ্য। এতে কোনো নির্দিষ্ট শান্তিচুক্তির শর্তের পরিবর্তে সম্ভাব্য আলোচনার কাঠামো নিয়ে কথা হয়েছে।
অন্যদিকে, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, চিঠিতে দুই দেশের কর্মকর্তাদের দ্রুত বৈঠকে বসার প্রস্তাব দিয়েছেন ভ্যান্স। আগের দফার আলোচনার মতো এবারও মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে পারেন তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রোববার কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা রেজাইয়ের কাছে চিঠিটি পৌঁছে দেন। আলোচনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত দিয়েছেন ভ্যান্স। ইরান প্রস্তাবে সম্মত হলে আগামী সপ্তাহে কাতার অথবা তুরস্কে বৈঠক হতে পারে।
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে চিঠি নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নেতারা প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তেহরান কূটনীতিকে আরও একটি সুযোগ দিতে চায়। বৃহস্পতিবার মোহসেন রেজাইয়ের আনুষ্ঠানিক জবাব দেওয়ার কথা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপসাগরীয় মিত্রদের সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে সতর্ক করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে স্বল্পমেয়াদি কিন্তু তীব্র সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে ট্রাম্প চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত নয়।
সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের খবরের মধ্যেই ভ্যান্সের চিঠি কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। তবে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য আলোচনায় অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপের ক্ষেত্রে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব, কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্কের কর্মকর্তারা সোমবার তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজাই এ ধরনের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, মোহসেন রেজাইকে সরাসরি চিঠি পাঠানোর মধ্য দিয়ে ইরানের ক্ষমতাকাঠামো সম্পর্কে ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।
তবে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং দুই দেশের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য আলোচনার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
সব মিলিয়ে, ভ্যান্সের চিঠি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে প্রস্তাবটির আনুষ্ঠানিক জবাব, সম্ভাব্য বৈঠকের অগ্রগতি এবং ওয়াশিংটনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর পরিস্থিতির গতিপথ নির্ভর করছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হবে, নাকি দুই দেশ আবারও সংঘাতের দিকে এগোবে—তা এখনো অনিশ্চিত।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা
মন্তব্য করুন