দেশের মানুষ আর আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ দেবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর অভিযোগ, অন্যায়, দুঃশাসন ও ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দলটি মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটিয়েছে।
শুক্রবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদরাসায় আয়োজিত ১০৪তম দুই দিনব্যাপী বার্ষিক দ্বীনি মহাসম্মেলনের সমাপনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন মাদরাসার মহাপরিচালক ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন ও আন্দোলনের সময় অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ধর্ম, দেশ এবং ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছিল। এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সংগঠনটির আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। এর আগে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ বিশিষ্ট আলেমরা সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেছেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ২৩ বছর সময় লেগেছে। আর ফ্যাসিবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী সরকারের হাত থেকে জনগণকে মুক্ত করতে ১৬ থেকে ১৭ বছর আন্দোলন করতে হয়েছে। এ সময়ে অনেক আলেম-ওলামা ও শিক্ষার্থী শহীদ হয়েছেন। তাঁদের অনেকের নাম ও কবরের ঠিকানা এখনো জানা যায়নি।
জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন। এর আগে ১৬ থেকে ১৭ বছরে প্রায় ৩ হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। নিজের গুমের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আল্লাহর রহমত ও মানুষের দোয়ায় তিনি বেঁচে আছেন।
এ সময় প্রায় ৭ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ হামলা-মামলার মাধ্যমে নিপীড়িত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
গার্মেন্টস খাতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টার পেছনে ফ্যাসিবাদী শক্তির হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিএনপি ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধের রাজনীতির মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, দেশের সব জনগোষ্ঠীর একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয় রয়েছে।
ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করা ব্যক্তিদের সমালোচনা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তাঁদের কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন দেখা যায় না; বরং বিভক্তি তৈরি হচ্ছে। স্বাধীনতার আগে ও পরে বিভ্রান্তিমূলক রাজনীতির কারণে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা অনুযায়ী দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রণীত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। পাশাপাশি সংবিধানে ইসলামী মূল্যবোধের বিষয়গুলোও ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, যারা গণহত্যা ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত, তারা এখনো দুঃখ প্রকাশ বা অনুশোচনা করেনি। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে যাওয়া ব্যক্তিরা দেশে ফিরে রাজনীতি করতে পারবেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও আদর্শগত বিভাজন থাকলেও গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্তদের রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে দেশের মানুষ একমত নয়। দীর্ঘ ১৭ বছর আলেম-ওলামাদের ওপর নির্যাতন, মসজিদে হামলা ও রক্তপাতের জন্য দায়ীদেরও জনগণ রাজনীতিতে দেখতে চায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের সমালোচনা করতে হবে গঠনমূলকভাবে। সরকারকে সহযোগিতা করা যেতে পারে, তবে দেশের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে নয়।
তিনি জানান, দেশের ঐক্য বজায় রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকার কাজ করতে চায়। পাশাপাশি আলেম-ওলামা ও কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন, স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া, জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমসহ বিভিন্ন আলেম-ওলামা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
মন্তব্য করুন