‘ক্লাবের মেসি আর জাতীয় দলের মেসি এক নন’—দীর্ঘ সময় ধরে এই একটি সমালোচনাই লিওনেল আন্দ্রেস মেসির ক্যারিয়ারের ওপর ছায়া ফেলেছিল। বার্সেলোনায় যখন তিনি একের পর এক রেকর্ড গড়ছিলেন, শিরোপার পর শিরোপা জিতছিলেন, তখন আর্জেন্টিনার জার্সিতে বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি না পাওয়ায় তাকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হতো।
নিন্দুকদের ধারণা ছিল, ক্লাব ফুটবলের সেই সাফল্য তিনি কখনোই জাতীয় দলের জার্সিতে আনতে পারবেন না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই সব সমালোচনার জবাব দেন এই আর্জেন্টাইন জাদুকর।
শৈশব থেকেই ফুটবলের সঙ্গে পথচলা শুরু মেসির। ১৯৮৭ সালে রোজারিওতে জন্ম নেওয়া এই প্রতিভা মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই ফুটবলে নিজের দক্ষতার জানান দেন। পরবর্তীতে নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজে খেলার সময় গ্রোথ হরমোনজনিত সমস্যায় তার ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়ে। চিকিৎসার ব্যয় বহন করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়লে শেষ পর্যন্ত বার্সেলোনা এগিয়ে আসে।
লা মাসিয়ার সেই যাত্রা থেকেই শুরু হয় এক কিংবদন্তির উত্থান। বার্সেলোনার হয়ে তিনি জিতেন অসংখ্য শিরোপা, গড়েন অসংখ্য রেকর্ড। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে শুরুতে সাফল্য ছিল অধরা।
২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে জাতীয় দলের হয়ে সাফল্যের শুরু হলেও সিনিয়র পর্যায়ে বারবার হতাশা অপেক্ষা করছিল। ২০০৭, ২০১১, ২০১৫ এবং ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকায় ফাইনালে গিয়েও ট্রফি হাতছাড়া হয় আর্জেন্টিনার।
এই ব্যর্থতার চাপ এতটাই তীব্র ছিল যে ২০১৬ সালে সাময়িক অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন মেসি। তবে তিনি ফিরে আসেন আরও শক্তভাবে।
বিশ্বকাপ মঞ্চে তার যাত্রা শুরু হয় ২০০৬ সালে। এরপর ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেও কাঙ্ক্ষিত শিরোপা ধরা দেয়নি। ২০১৪ সালে ফাইনালে উঠেও অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির কাছে হেরে যান তিনি, তবে টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার জেতেন।
২০১৮ সালে আবারও হতাশা, শেষ ষোলোতেই বিদায়। কিন্তু সব বদলে যায় ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে। সৌদি আরবের বিপক্ষে হার দিয়ে শুরু হলেও এরপর টানা জয় এনে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে পৌঁছে দেন মেসি।
ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে নাটকীয় ম্যাচে টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা। সেই সঙ্গে ঘুচে যায় ৩৬ বছরের বিশ্বকাপ শিরোপা খরা। মেসি হয়ে ওঠেন বিশ্বজয়ী অধিনায়ক।
এর আগেই ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর ফিনালিসিমা ও পরবর্তী কোপা আমেরিকা জয় আর্জেন্টিনাকে এনে দেয় ধারাবাহিক সাফল্য।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, বরং আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও প্রভাবশালী খেলোয়াড়। শুরুতে যাকে ব্যর্থ বলা হতো, তিনিই এখন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় নায়ক।
মন্তব্য করুন