স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশকে অতিরিক্ত তিন বছর সময় দিয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এলডিসি উত্তরণের জন্য ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময় পাচ্ছে বাংলাদেশ। একই সুযোগ দেওয়া হয়েছে নেপালকেও।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়। বাংলাদেশ ও নেপালের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং উত্তরণ প্রক্রিয়ার কারণে উন্নয়ন পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও প্রকল্পে যেন বাধা সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতেই বাড়তি সময় দেওয়া হয়েছে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ‘গ্রুপ অব ৭৭ ও চীন’-এর পক্ষে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে উরুগুয়ে।
পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল বাংলাদেশের। তবে নতুন প্রস্তাবে স্বীকার করা হয়েছে, উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করলেই কোনো দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর হয়ে যায় না।
প্রস্তাবে বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, নেপালকে উত্তরণ কৌশল পুনর্বিন্যাস এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণের জন্য সুস্পষ্ট ও সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাব উত্থাপনের সময় উরুগুয়ে জানায়, কোভিড-১৯ মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের মতো ধারাবাহিক অভিঘাত উত্তরণের প্রস্তুতিকে জটিল করে তুলেছে।
‘গ্রুপ অব ৭৭ ও চীন’ আরও উল্লেখ করে, এসব বাহ্যিক সংকট অভিবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও পর্যটন খাতের ওপর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলোও আরও প্রকট হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে আয়ারল্যান্ড সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে। তবে তারা বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ ব্যতিক্রমী ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সংকট মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছে সংস্থাটি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। তাদের সতর্কতা, উত্তরণের মানদণ্ড পূরণের পরও কোনো দেশকে দীর্ঘ সময় এলডিসি তালিকায় রাখা হলে পুরো কাঠামোর কার্যকারিতা দুর্বল হতে পারে। এতে বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক সংকেত পাঠানোসহ উত্তরণের সম্ভাব্য সুবিধা পাওয়াও বিলম্বিত হতে পারে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, বিদ্যমান কাঠামো অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন সময়সীমা বাড়ানোর যৌক্তিক কারণ হতে পারে না। তবে বাংলাদেশ ও নেপালের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েছে তারা।
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের পক্ষে কানাডা বাংলাদেশ ও নেপালকে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত অগ্রগতির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনীতির বৈচিত্র্য আনা এবং অর্থনৈতিক সহনশীলতা জোরদারে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ফ্রান্স।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, সময়সীমা বাড়ানোর অর্থ এই নয় যে ‘হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ পাওয়া গেছে’।
তিনি বাংলাদেশের সরকারকে জাতীয় অগ্রাধিকার এবং উত্তরণ প্রক্রিয়ার কারণে জীবিকার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ও সুনির্দিষ্ট সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর ২০১৮ ও ২০২১ সালের ধারাবাহিক পর্যালোচনায় দেশটি এলডিসি উত্তরণের তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করে।
মানদণ্ডগুলো হলো—
মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়;
মানবসম্পদ সূচক;
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত নাজুকতা সূচক।
২০২১ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের বিষয়টি অনুমোদন করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। কোভিড-১৯ পরিস্থিতি বিবেচনায় তখন পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময় দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ নানা অভিঘাতের কথা তুলে ধরে ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ আরও তিন বছর সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানায়। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হলো।
মন্তব্য করুন