মার্কেটিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দায়িত্বশীল ব্যবহার ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় নিয়ে দুই দিনের আলোচনার মধ্য দিয়ে রাজধানীর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং ফোরাম ৬.০। গত ৩০ ও ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক আয়োজনে দেশি-বিদেশি মার্কেটিং পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, সরকারি প্রতিনিধি ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির সৌজন্যে এবং এসিআই মটরস লিমিটেডের সঞ্চালনায় আয়োজিত ফোরামের আহ্বায়ক ছিল ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিল। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের অংশীদারত্বে ফোরামটির কো-হোস্ট ছিল বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম।
আন্তর্জাতিক এই আয়োজনের ষষ্ঠ আসর এবার বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইন মার্কেটিং: হিউম্যান + টেক’। মানুষের অন্তর্দৃষ্টি, নৈতিকতা ও ভোক্তার আস্থা অটুট রেখে মার্কেটিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটিই ছিল দুই দিনের আলোচনার মূল বিষয়। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন আধুনিক মার্কেটিংয়ের জনক হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক ফিলিপ কটলার।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিল (ডব্লিউএমসি) ও মার্কেটিং সোসাইটি অব বাংলাদেশের (এমএসবি) সেক্রেটারি জেনারেল এবং বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের গ্রুপ চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ও এক্সিকিউটিভ এডিটর সাজিদ মাহবুব।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মার্কেটার, শিক্ষাবিদ ও শিল্পনেতাদের ঢাকায় স্বাগত জানাতে পেরে আয়োজকেরা সম্মানিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রাহককে সেবা দেওয়ার ধরন বদলে দিচ্ছে, তবে মার্কেটিংয়ের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে মানুষই। প্রযুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ গড়তে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মুজিবুল হক। তিনি আন্তর্জাতিক অতিথিদের স্বাগত জানানোর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ভবিষ্যতের জন্য মার্কেটারদের প্রস্তুত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
দুই দিনের এই আয়োজনে ১০টি কিনোট সেশন, দুটি কেইস স্টাডি এবং দুটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিলের উদ্যোগে উপস্থাপন করা হয় ‘দ্য ঢাকা ডিক্লারেশন’।
‘মার্কেটিং ফর গ্লোবাল গুড: ওয়াই ২০৩০ অ্যান্ড বিয়ন্ড’ প্রতিপাদ্যে ঘোষণাটি গ্রহণে অংশ নেয় এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশন, আফ্রিকান মার্কেটিং কনফেডারেশন এবং ইউরোপিয়ান মার্কেটিং কনফেডারেশন। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের ৫৪টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিন্ন লক্ষ্য ও অঙ্গীকার এতে প্রতিফলিত হয়েছে। বৈশ্বিক কল্যাণে বিপণনচর্চার প্রসার, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং ২০৩০ সালের পরবর্তী সময়ের জন্য সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রথম দিনের কিনোট পর্বের সূচনা করেন অধ্যাপক ফিলিপ কটলার। মার্কেটিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানুষের বিচারবুদ্ধি কীভাবে পাশাপাশি কাজ করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দেওয়া বক্তব্যে কটলার বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবসার দক্ষতা বাড়াতে, গ্রাহকের চাহিদা বুঝতে, বাজারের নতুন সুযোগ চিহ্নিত করতে এবং বিক্রি ও মুনাফার পূর্বাভাস দিতে সহায়তা করতে পারে। তবে প্রযুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে ধাপে ধাপে ও দায়িত্বশীলভাবে এটি গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।
তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সক্ষমতাকে সহায়তা করবে, প্রতিস্থাপন করবে না। তাই মার্কেটিংয়ে মানুষের সৃজনশীলতা, তদারকি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা অপরিহার্য। এ ছাড়া গ্রাহক বৃদ্ধি, ব্র্যান্ড গঠন, বাজেট ও আর্থিক কার্যক্রমের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে মার্কেটিং ও ফাইন্যান্স বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতা, ব্যয় ও মুনাফায় কতটা সুফল দিচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়নের ওপরও জোর দেন কটলার।
প্রথম দিনের আরেকটি কিনোট সেশনে বক্তব্য দেন ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং ফোরামের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা হারমাওয়ান কারতাজায়া। তাঁর আলোচনায় উঠে আসে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা, আস্থা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ের বিষয়টি।
কারতাজায়ার মতে, বাজারে নিজেদের আলাদা করে তুলতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাহকের পরিবর্তিত চাহিদা, সামাজিক প্রত্যাশা ও সাংস্কৃতিক ধারা বুঝতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ ও উন্নত গ্রাহক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে, তবে তা পরিচালিত হতে হবে মানুষের দায়িত্ববোধ দিয়ে।
এ জন্য প্রচলিত প্রতিযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে নতুন পণ্য, অভিজ্ঞতা ও বাজার তৈরির মাধ্যমে ‘জেনারেটিভ অ্যাডভান্টেজ’ অর্জনের আহ্বান জানান তিনি। মার্কেটিংকে শুধু মুনাফার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিক ব্যবসা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজ ও পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন।
প্রথম দিনের অন্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন গুগলের হেড অব পার্টনার পারফরম্যান্স, চ্যানেল সেলস—এসইএ তারা ইউন এবং মালয়েশিয়ার আইট্রেইন এশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা এরিক কু। মানুষের কৌতূহল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে কার্যকর মার্কেটিং এবং সাধারণ ভোক্তাদের কনটেন্ট নির্মাতা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে তাঁরা আলোচনা করেন।
দ্বিতীয় দিনের কিনোট পর্বের শুরুতে বক্তব্য দেন ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক সৈয়দ ফরহাত আনোয়ার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মার্কেটিংয়ের অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে তুলে ধরে ব্র্যান্ড ও ভোক্তার ওপর এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
এরপর বক্তব্য দেন থাইল্যান্ডের মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশনের দ্বিতীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. ড্যান ভিসিতচাইচান। মানুষের চিন্তাশক্তি ও বুদ্ধিমান যন্ত্রের অংশীদারত্বকে মার্কেটিংয়ের ভবিষ্যৎ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন তিনি।
আফ্রিকান মার্কেটিং কনফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট হেলেন ম্যাকইনটি-কার্লাইল আলোচনা করেন গ্লোকাল মার্কেটিংয়ের সাম্প্রতিক ধারা নিয়ে। বদলে যাওয়া বিশ্বে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো কীভাবে স্থানীয়ভাবে প্রাসঙ্গিক থাকতে পারে, সেটিই ছিল তাঁর আলোচনার মূল বিষয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক মার্কেটিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে বাড়তে থাকা উৎপাদনশীলতার সুফল কারা পাচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করেন। ভসু.এআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা নাফিস ফয়সাল একজন উদ্যোক্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এআইয়ের ভবিষ্যৎ তুলে ধরেন। ইউরোপিয়ান মার্কেটিং কনফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট রালফ স্ট্রাউস আলোচনা করেন মার্কেটিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিয়ে।
কিনোট সেশনের পাশাপাশি দুটি প্যানেল আলোচনায় উঠে আসে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন প্রশ্ন। প্রথম দিনের প্যানেলে আলোচনা হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সমান করতে পারে কি না। সাশ্রয়ী প্রযুক্তি কীভাবে ছোট ব্যবসাকে বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে পারে, সে বিষয়ে মত দেন আলোচকেরা।
দ্বিতীয় দিনের প্যানেলে গুরুত্ব পায় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার বিষয়টি। একাডেমিক গবেষণা কীভাবে প্রতিষ্ঠানের বাস্তব কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারীরা।
এর বাইরে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এবং কোরিয়ার কে-কালচারে কৃত্রিম ও অ্যানালগ বুদ্ধিমত্তার মেলবন্ধন নিয়ে দুটি কেইস স্টাডি উপস্থাপন করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়েও বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
ফোরামের বিভিন্ন সেশনে আরও বক্তব্য দেন এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশনের পার্টনার ও প্রেসিডেন্ট জ্যাক ইয়াও, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রো ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী, ড্রিম কোম্পানির চিফ ইমাজিনেশন অফিসার অধ্যাপক বুজং কিম, সের্গেই স্পিভাকভস্কি, আশরাফ বিন তাজ, রোহান সোমাওয়ানসা, ড. নুসরাত হাফিজ, ড. শরিফুল ইসলাম দুলু, অধ্যাপক মোসাদ্দেক আহমেদ চৌধুরী, খায়রুল বাশার, এনোক পেরেরা, তৌফিক, ড. জাহিদ হালিম, সৈয়দ ইকবাল মাহমুদ হোসেন ও আফসানা আক্তারসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
ফোরামের শেষ ভাগে এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশন, আফ্রিকান মার্কেটিং কনফেডারেশন, ইউরোপিয়ান মার্কেটিং কনফেডারেশন এবং ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিল যৌথভাবে ‘ঢাকা ডিক্লারেশন: মার্কেটিং ফর গুড’ ঘোষণা করে। এরপর সমাপনী সেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুই দিনের আয়োজন।
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির সৌজন্যে, এসিআই মটরস লিমিটেডের সঞ্চালনায় এবং প্রাণের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয় ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং ফোরাম ৬.০। আয়োজনের দায়িত্বে ছিল বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম। সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্ত ছিল এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশন, ইউরোপিয়ান মার্কেটিং কনফেডারেশন, আফ্রিকান মার্কেটিং কনফেডারেশন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক বিজনেস স্কুল, মার্কেটিং সোসাইটি অব বাংলাদেশ, মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ, ব্যাকপেজ পিআর এবং ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিল।
মন্তব্য করুন