আব্বাসীয় খেলাফতের শুরুর দিকের কথা। খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর কুফার কাজির পদ দিতে চাইলেন এমন একজন আলেমকে, যাঁর নাম তখন ইরাকের হাদিসচর্চার জগতে ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রস্তাবের সঙ্গে একটি শর্তও ছিল—রাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে কোনো রায় দেওয়া যাবে না। সুফিয়ান ইবনে সাঈদ আস-সাওরি পদটি গ্রহণ করলেন না। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, এরপর তিনি কুফা ছেড়ে যান এবং জীবনের বাকি সময় কাটান আত্মগোপনে, এক শহর থেকে আরেক শহরে।
পদ ফিরিয়ে দিয়ে যিনি পালিয়ে বেড়ালেন, তিনিই পরে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী মুহাদ্দিস ও ফকিহ হিসেবে স্বীকৃতি পান। আজ তাঁর নামে কোনো মাজহাব প্রচলিত নেই। তবু হাদিস ও ফিকহের ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন।
সুফিয়ান সাওরির জন্ম ৯৭ হিজরিতে, ইংরেজি হিসাবে ৭১৫ বা ৭১৬ সালে। জীবনীকারদের মধ্যে এ বিষয়ে বড় ধরনের মতভেদ নেই। ইমাম জাহাবি তাঁর জন্মসাল সম্পর্কে লিখেছেন, সবাই একমত যে সেটি ৯৭ হিজরি। কিছু বর্ণনায় অবশ্য ৯৫, ৯৬ বা ৯৮ হিজরির কথাও পাওয়া যায়। জন্মস্থান হিসেবে প্রচলিত মত কুফা, যদিও কোনো কোনো বর্ণনায় খোরাসানের নামও এসেছে।
তখনকার কুফা ছিল ইরাকের হাদিস ও ফিকহচর্চার অন্যতম বড় কেন্দ্র। তাঁর পিতা সাঈদ ইবনে মাসরুক ছিলেন একজন তাবেয়ি, নির্ভরযোগ্য হাদিসবিশারদ এবং ইমাম শা’বির শিষ্য। সুফিয়ানের দুই ভাই ওমর ও মুবারকও পিতার কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।
সুফিয়ান নিজে ছিলেন তাবে-তাবেয়ি। তাঁর ইলমচর্চার শুরু ঘর থেকেই। পিতার তত্ত্বাবধানে অল্প বয়সেই তিনি জ্ঞান অর্জন শুরু করেন।
কোরআনের কিরাত তিনি শিখেছিলেন হামজা আজ-জাইয়াতের কাছে, যিনি ‘সাত কারির একজন’ হিসেবে পরিচিত। হাদিসশিক্ষকদের তালিকায় রয়েছেন আইয়ুব সাখতিয়ানি, আবু ইসহাক আস-সাবিয়ি, মানসুর ইবনে মুতামির ও হাবিব ইবনে আবু সাবিতের মতো বিশিষ্ট আলেম।
জীবনীগ্রন্থে তাঁর শিক্ষকের সংখ্যা ছয় শ বলা হয়েছে। জ্ঞানের সন্ধানে তিনি কুফা, বসরা ও হিজাজসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন।
হাদিস মুখস্থ রাখা ও যাচাই করার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে পরবর্তী মুহাদ্দিসরা তাঁকে ‘আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদিস’—অর্থাৎ হাদিস জগতের নেতা—উপাধিতে ভূষিত করেন। ইমাম জাহাবি তাঁকে ‘শাইখুল ইসলাম’ ও ‘ইমামুল হুফফাজ’ বলেও উল্লেখ করেছেন।
সমসাময়িক বড় আলেমদের মূল্যায়নেও তাঁর মর্যাদার পরিচয় পাওয়া যায়।
সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা বলেছেন, হালাল-হারামের জ্ঞানে সুফিয়ান সাওরির চেয়ে বড় আলেম তিনি দেখেননি।
আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেছেন, পৃথিবীতে সুফিয়ান সাওরির চেয়ে বেশি জ্ঞানী কাউকে তিনি জানেন না।
এই উক্তিগুলো ইবনে আবি হাতিমের আল-জারহ ওয়াত-তা’দিল, আবু নুয়াইমের হিলয়াতুল আউলিয়া ও খতিব বাগদাদির তারিখু বাগদাদ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।
সুফিয়ান সাওরির কাছে হাদিস ও ফিকহ শিখতে আসা আলেমদের তালিকা দীর্ঘ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান, আবদুর রহমান ইবনে মাহদি এবং ওয়াকি ইবনুল জাররাহ।
ইমাম মালেক ও ইমাম আওজায়ির নামও কখনো তাঁর ছাত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে তাঁরা ছিলেন প্রায় সমবয়সী বা সমসাময়িক। তাই তাঁদের সম্পর্ককে সরাসরি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের বদলে পারস্পরিক হাদিস বর্ণনার সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করাই নিরাপদ।
সুফিয়ান সাওরি নিজেও ছিলেন একজন প্রভাবশালী ফকিহ বা ইসলামি আইনজ্ঞ। ইরাকে তাঁর ফিকহি মত এতটাই গুরুত্ব পেয়েছিল যে ‘সাওরি মাজহাব’ নামে একটি ধারা গড়ে ওঠে। তবে অনুসারীর অভাবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
তাঁর রচনার মধ্যে আল-জামিউল কাবির, আল-জামিউস সাগির, তাফসির এবং ফারায়েজবিষয়ক গ্রন্থের কথা জানা যায়।
ইতিহাস ও জীবনীগ্রন্থে বর্ণিত আছে, আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর তাঁকে কুফার কাজির পদ গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে শর্ত ছিল, রাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে কোনো রায় দেওয়া যাবে না। সুফিয়ান সাওরি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, নিয়োগপত্র তিনি ছিঁড়ে ফেলেছিলেন।
এরপর তিনি কুফা ছেড়ে মক্কায় চলে যান। কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, মক্কা থেকে সমুদ্রপথে ইয়েমেনে গিয়ে মা’মার ইবনে রাশেদের দরসেও অংশ নিয়েছিলেন। পরে মক্কায় ফিরে গোপনে বাছাই করা ছাত্রদের পড়াতেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা ও ফুজাইল ইবনে ইয়াজ।
আল-মানসুরের পর খলিফা হন আল-মাহদি। একটি বর্ণনা অনুযায়ী, ১৫৩ হিজরির হজের মৌসুমে আল-মাহদির নির্দেশে সুফিয়ান সাওরির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
খলিফার নির্দেশের পর সুফিয়ান সাওরি বসরায় চলে যান। সেখানে হাম্মাদ ইবনে জায়েদ ও হাম্মাদ ইবনে সালামার মতো আলেমরা তাঁকে আশ্রয় দেন।
একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর তিনি ক্লান্ত হয়ে খলিফার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।
১৬১ হিজরিতে, ৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে বসরায় ইন্তেকাল করেন এই মহান মুহাদ্দিস। কোনো কোনো বর্ণনায় তাঁর মৃত্যুর তারিখ ১৫ শাবান উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৬৪ বছর।
সুফিয়ান সাওরি শাসকদের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহে নামেননি। আবার তাঁদের পদ ও পুরস্কার গ্রহণ করে নিজের জ্ঞান ও বিচারবোধকে ক্ষমতার প্রভাবে আবদ্ধ করতেও রাজি হননি। এই অবস্থান ধরে রাখার মূল্য তাঁকে বছরের পর বছর আত্মগোপনে থেকে দিতে হয়েছে।
তাঁর জীবন ইতিহাসের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—জ্ঞানী মানুষের স্বাধীনতা কোথায় শেষ হয়, আর ক্ষমতার প্রভাব কোথায় শুরু হয়?
সুফিয়ান সাওরির জীবন যেন সেই প্রশ্নেরই এক উত্তর। তাঁর কাছে ইলম ছিল আমানত। সেই আমানতের হিসাব ক্ষমতার কাছে নয়, নিজের বিবেক ও আল্লাহর কাছে দিতে হয়—এমন আদর্শই তাঁর জীবন থেকে পাওয়া যায়।
সূত্র: শামসুদ্দিন আজ-জাহাবি, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ৭/২২৯–২৭৯; আবু নুয়াইম আল-ইসবাহানি, হিলয়াতুল আউলিয়া, ৬/৩৫৬ ও ৭/১৪৪; খতিব বাগদাদি, তারিখু বাগদাদ, ৯/১৫১–১৭৪; ইবনে আবি হাতিম, আল-জারহ ওয়াত-তা’দিল, তাকদিমা, ১/৫৫–১২৫।
মন্তব্য করুন