স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত হওয়ার পর সরকারের জবাবদিহি ও সংশ্লিষ্টদের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে রাজধানী মাদ্রিদে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) তোলেদো প্রদেশের উরদা এলাকার কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার কারণ ও রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে তদন্তের পাশাপাশি সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। খবর এপি ও এল পাইসের।
দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদে স্পেনের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন কয়েক শ মানুষ। অতি-ডানপন্থী সংগঠন ফালাঞ্জে ও রেভুয়েলতার আহ্বানে আয়োজিত এই সমাবেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তের পদত্যাগ দাবি করা হয়।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে কিছু অংশগ্রহণকারী পুলিশের ব্যারিকেডের দিকে এগিয়ে যান এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ফ্লেয়ার ও বিভিন্ন বস্তু ছোড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে এবং বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ঘটনাটি নিয়ে রয়টার্সের প্রকাশিত ভিডিও বিবরণেও এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সমাবেশে ফালাঞ্জের মুখপাত্র ফেদেরিকো ক্যাম্পানেরো সরকারের সমালোচনা করে বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দায়ীদের সরিয়ে দেওয়ার আগে আরও কত মানুষের প্রাণহানি ঘটতে হবে? তবে দুর্ঘটনার দায় কার, তা এখনো তদন্তসাপেক্ষ।
মাদ্রিদের কেন্দ্রস্থল প্লাজা দে সিবেলেসে ডানপন্থী দল ভক্স ও তাদের সমর্থক ট্রেড ইউনিয়ন সোলিদারিদাদ পৃথক সমাবেশের আয়োজন করে। সেখানে দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সমাবেশে অংশ নেওয়া অনেকের হাতে ‘দুর্নীতিই হত্যা করে’ লেখা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। এই সমাবেশটি বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শেষ হয়।
স্পেনের তোলেদো প্রদেশের উরদার কাছে রেনফের একটি এভিই দ্রুতগতির ট্রেন একই লাইনে থেমে থাকা ইরিও ট্রেনের পেছনে ধাক্কা দেয়। এতে ট্রেনের কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয় এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেলপথের নিরাপত্তাব্যবস্থা এলজেডবি (LZB)-তে ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর কয়েকটি ট্রেন থেমে যায়। এরপর মাদ্রিদের আতোচা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে ট্রেনগুলোকে চলাচল পুনরায় শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এল পাইসের হাতে আসা যোগাযোগের অডিও রেকর্ডে দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে এভিই ট্রেনটিকে স্বাভাবিক গতিতে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, সামনে থাকা ইরিও ট্রেনের চালকও সমস্যার কথা জানান এবং ট্রেনটি থেমে থাকার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রকে অবহিত করেন।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারায় গুরুতর ত্রুটি ছিল কি না, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ ও দায় নির্ধারণের জন্য তদন্তের ফলের অপেক্ষা করতে হবে।
স্পেনে চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি কর্ডোবা প্রদেশের আদামুজের কাছে দুই ট্রেনের সংঘর্ষে ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন। উরদার দুর্ঘটনাটি সেই ঘটনার পর একই বছরে আরেকটি বড় রেল বিপর্যয়।
পরপর প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণে দেশটির রেল অবকাঠামো, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ, সিউদাদ রিয়াল ও আন্দালুসিয়ার মধ্যে রেল চলাচলও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
দুর্ঘটনার পর স্পেনের সরকার ও সংশ্লিষ্ট রেল কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির দাবি উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
অন্যদিকে, দুর্ঘটনার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হয়েছিল, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের নির্দেশনা যথাযথ ছিল কি না এবং সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও সংঘর্ষ ঠেকানো গেল না কেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগকে তদন্তে যাচাইযোগ্য দাবি হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন