মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলার তৎপরতা বাড়িয়েছে ইরান—এমন গোয়েন্দা সতর্কতার খবর সামনে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে মার্কিন দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনের জরুরি নয় এমন কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, ইরানের সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনার কিছু অংশ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে ইরান এসব হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না, কিংবা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা কতটা—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের হাতে কী ধরনের অস্ত্র রয়েছে এবং সেগুলো দিয়ে বিদেশে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা কতটা ঝুঁকিতে পড়তে পারে?
ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে মার্কিন কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তাঁদের অনেকে কর্মস্থলে ফিরে যান। কিন্তু নতুন গোয়েন্দা সতর্কতার পর আবারও কয়েকটি দেশে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনের কর্মীসংখ্যা কমানো হচ্ছে।
২১ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে অবস্থিত দূতাবাস থেকে জরুরি নয় এমন কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দেয়। কারণ হিসেবে সৌদি আরবে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়।
জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লেবাননে থাকা মার্কিন কূটনৈতিক মিশন থেকেও কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার খবর প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
এক মার্কিন কূটনীতিক সিএনএনকে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে দূতাবাস ও মিশনগুলোর কার্যক্রমের পরিস্থিতি ‘বিশৃঙ্খল’ বললেও কম বলা হবে। আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র নিকি গেমারও জানিয়েছেন, কর্মীদের অনেকে ফিরে এসে কাজ গুছিয়ে নেওয়ার পর আবার দেশ ছাড়ার নির্দেশ পেয়েছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের ২৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে একটি স্মারক পাঠিয়েছেন। এতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মেমোতে কিছু প্রাণঘাতী হামলার পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করা মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নাগরিকদের প্রতি ইরানের হুমকি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ইউরোপেও মার্কিন কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য কিছু লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের তথ্য পাওয়া গেছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে ইরানের এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা সীমিত বলে মন্তব্য করেছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য, গোয়েন্দা তথ্যে উঠে আসা সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা তেহরানের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে।
ইরানের সামরিক সক্ষমতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি দেশটির ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য।
ইরানের হাতে স্বল্প ও মধ্যমপাল্লার বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। ফাতেহ, জুলফাগর, কিয়াম-১, শাহাব-১ ও শাহাব-২ স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে পড়ে। অন্যদিকে শাহাব-৩, এমাদ, গাদর-১, খোররামশাহর, সেজিল, খাইবার শেকান ও হাজ কাসেম মধ্যমপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে পরিচিত।
বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে, এসব ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ১৫০ থেকে ২ হাজার কিলোমিটার বা তারও বেশি। ফলে ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় থাকতে পারে।
সেজিল ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষত্ব হলো, এটি কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করে। ফলে তরল জ্বালানির ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় দ্রুত উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে হামলার চেষ্টার পর। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের দাবি, ২০ মার্চ ইরান ওই দ্বীপ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। একটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে ভেঙে পড়ে। অন্যটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে ইরান এ হামলার দায় অস্বীকার করেছে।
দিয়েগো গার্সিয়া ইরান থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে। বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পেরেছিল। এ ঘটনা ইরানের ঘোষিত ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে এ থেকে ইরানের হাতে নিশ্চিতভাবে ৪ হাজার কিলোমিটার পাল্লার কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। ক্ষেপণাস্ত্রটির প্রকৃত ধরন, গতিপথ ও সক্ষমতা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ইরানের সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সরাসরি হামলার জন্য বিভিন্ন ধরনের ড্রোন তৈরি করেছে দেশটি।
শাহেদ, আবাবিল ও মোহাজের সিরিজের ড্রোন ইরানের পরিচিত সামরিক ড্রোনগুলোর মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে শাহেদ-১৩৬ একমুখী হামলার ড্রোন হিসেবে পরিচিত। বিস্ফোরক বহন করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর এ ধরনের ড্রোন ধ্বংস হয়ে যায়।
তুলনামূলক কম খরচে অনেক ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহার করা যায়। ফলে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলার কৌশল হিসেবে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬-এর প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে গেরান-২ নামের ড্রোন ব্যবহার করেছে।
ইরান ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ও উৎক্ষেপণের জন্য ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ এবং সুরক্ষিত স্থাপনা তৈরি করেছে। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় এসব স্থাপনা ‘মিসাইল সিটি’ নামে পরিচিত।
ভূগর্ভে ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রাখার ফলে বিমান হামলায় একবারে পুরো সক্ষমতা ধ্বংস করা কঠিন হতে পারে। এসব ঘাঁটি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে ইরান।
২০২৩ সালে দেশটি নিজেদের তৈরি হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচনের দাবি করে। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, এর গতি শব্দের চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ বেশি হতে পারে। তবে এসব অস্ত্রের প্রকৃত কার্যকর সক্ষমতা নিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সীমিত।
ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ক্ষেত্রে সমুদ্রের তলদেশে থাকা যোগাযোগের তার বা সাবমেরিন কেবল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরের তলদেশে থাকা যোগাযোগের কেবলগুলো লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) রাজনৈতিক বিভাগের উপপ্রধান ইয়াদউল্লাহ জাভানির বক্তব্যেও হরমুজ প্রণালির নিচে থাকা কয়েকটি বড় ইন্টারনেট কেবলকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু করার হুমকির কথা উঠে এসেছে।
এসব কেবলে হামলা হলে ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। তবে এ ধরনের হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
ইরানের আরেকটি কৌশলগত শক্তি হলো হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরে সামরিক চাপ তৈরির সক্ষমতা। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই প্রণালি।
জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ-মাইন, ড্রোন ও দ্রুতগতির নৌযান ব্যবহার করে ইরান এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ ও সামরিক নৌযানের চলাচলে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যেও প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা শুরু করলে তারা আগের তুলনায় আরও আক্রমণাত্মক কৌশলে জবাব দেবে। বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বিও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মান, পাল্লা ও শক্তি বেড়েছে বলে দাবি করেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৬ অক্টোবর মিসিসিপিতে এক নির্বাচনী সমাবেশে দাবি করেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলো ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তাঁর দাবি, এসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরেও হামলা চালানো সম্ভব।
তবে ইরানের বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি আঘাত হানার বিষয়টি নিশ্চিত নয়। দেশটির ঘোষিত ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা মূলত ২ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দিয়েগো গার্সিয়া-সংক্রান্ত ঘটনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে হামলার সক্ষমতার প্রমাণ নয়।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সেনা, সামরিক ঘাঁটি, কূটনৈতিক স্থাপনা এবং মিত্রদেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ইরানের বিভিন্ন অস্ত্রের আওতায় রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন, ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা এবং হরমুজ প্রণালিতে চাপ তৈরির সক্ষমতা ওয়াশিংটনের উদ্বেগের বড় কারণ। তবে বিদেশে মার্কিন কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে গোয়েন্দা সতর্কতা এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বাস্তব সক্ষমতা—দুটি বিষয় আলাদা করে বিবেচনা করা জরুরি।
তথ্যসূত্র: অ্যাক্সিওস, নিউইয়র্ক টাইমস, আল-জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি ও দ্য কনভারসেশন।
মন্তব্য করুন